‘রাতের রাজা’ কারা?

‘রাতের রাজা’ কারা?

এস এম আববাস

কোনও নারীর বাসায় ইয়াবা ও মদের বোতল পাওয়া গেলে কিংবা ওই নারী পুরুষদের ব্ল্যাকমেইল করলে তাকে ‘রাতের রানী’ বলে অভিহিত করা যাবে এমনটা আমার আগে জানা ছিল না। সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনামে এই সম্বোধন দেখে মনে প্রশ্ন জেগেছে, সত্যিই কি এমনটা বলা যায়? আর যদি বলা যায়, তবে একই অপরাধ একজন পুরুষ করলে তাকেও কি ‘রাতের রাজা’ বলা যাবে?
 
আরও কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অভিযুক্ত নারী যদি ‘রাতের রানী’ হয় তাহলে ‘রাতের রাজা’ কারা? গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে যতটুকু মনে হয়েছে ‘রাতের রানী’ বলতে মদ ইয়াবার গল্প ছাড়াও অন্য কোনও ইঙ্গিত সেখানে রয়েছে। যে ইঙ্গিত করা হয়েছে তেমন কাজ কোনও পুরুষ করলে তাকে কি ‘রাতের রাজা’ বলা যাবে?   

গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরেকটি খবরে দেখা গেছে মদের পার্টি আয়োজনকারীদের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে তাকে ‘রাতের রাজা’ বলা হয়নি। আবার মদের পার্টি সংক্রান্ত অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদেরও ‘রাতের রাজা’ বলা হয়নি। তাহলে নারী হলেও তাকে ‘রাতের রানী’ বলা হবে– এসব প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। 


বুধবার (৪ আগস্ট) রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘রাতের রাজা’দের গ্রেফতার করার দাবি করে পোস্ট-কমেন্ট দেখা গেছে।  এতে শুধু আমার মনেই প্রশ্ন জাগেনি অন্যদেরও জেগেছে রাতের রাজা কারা?

প্রকাশিত সংবাদে গণমাধ্যম ‘রাতের রানী’ সম্বোধন করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। অবশ্য সম্বোধনের দায় নেয়নি গণমাধ্যমগুলো। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দেওয়া হয়েছে সংবাদে। এখানে আরও কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল বাহিনী বিশেষ করে জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় যে সংস্থা কাজ করে সেই সংস্থা এই নেতিবাচক বিশেষণে সম্বোধন করার অধিকার রাখে কিনা? আর কোনও বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন বা বক্তব্যে এমন সম্বোধন করা হলেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত কিনা?

এবার এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক। আমরা জানি, নারী বা পুরুষ যেই হোক, অপরাধ প্রমাণের পর তাদের অপরাধী সম্বোধন করে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু অপরাধ প্রমাণের আগে অভিযোগ পর্যায়ে কোনও ব্যক্তিকে অপরাধী বলার সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, একজন সংবাদকর্মী প্রতিবেদন তৈরির সময় নিজের দায় ঘাড়ে নিয়ে অপরাধীর নামের আগে বা পরে কোনও নেতিবাচক বিশেষণ যুক্ত করতে পারেন না। কেউ এমন বিশেষণ যুক্ত করে বক্তব্য দিলেও তার বক্তব্য প্রকাশ করা হবে কিনা তা গণমাধ্যমকর্মী এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে ভাবতে হবে।  কারণ এটি সমাজে ভালো কোনও মেসেজ দিচ্ছে কিনা, সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি ছাড়াও অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা? অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে তার সন্তানদের ওপর তার চেয়ে বেশি শাস্তি নেমে আসবে কিনা এসব অবশ্যই ভাবতে হবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বা ভাবা জরুরি বলে আমার কাছে এ জন্যই মনে হয়েছে যে, সাম্প্রতিক একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম দেখে। ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষণ যুক্ত করে শিরোনাম করা প্রতিবেদনের ভেতরে তা ব্যবহার করার রীতি দীর্ঘদিনের। তবে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করে এমনটি করা যায় কিনা সে প্রশ্নটি আজ উত্থাপন করতেই হচ্ছে।   

মডেল বা তথাকথিত মডেলকে ‘রাতের রানী’ বলা হলে অপরাধী বলে বিবেচিত করা সহজ হয় কি? নাকি অন্য যারা মডেল আছেন তাদের কাজের জায়গা ঝুঁকিতে পড়ে? মডেলিং পেশাটির ক্ষতি করা নয় কি?  

কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, কোনও পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় কিংবা সমাজে এর বিরুপ প্রভাব পড়ে, এমন কিছু কি গণমাধ্যমে হাইলাইট করা উচিত? অপরাধীর পেশাকে অপরাধের মানদণ্ড বিবেচনা করার মতো সুক্ষ্ম সুযোগ রেখে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে কেন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায়হীনভাবে অনেকে ঢালাও মন্তব্য করে থাকেন। তা আমলে না নিলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ মানুষ আস্থায় নেবে এটাই স্বভাবিক। আর সে কারণেই গণমাধ্যমকে ভাবতে হবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে। 

সংবাদের উৎস থেকে নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা হলেই কি গণমাধ্যমকর্মী সেটি ফলাও করে প্রচারের ব্যবস্থা করবেন? একজন গণমাধ্যমকর্মীকে নেতিবাচক শব্দগুলো সামনে এনে প্রতিবেদন লিখবেন কিনা তা তাকে ভাবতে হবে। বিশেষণ যুক্ত করলে ভালো নাকি মন্দ তা বিবেচনায় নিতে হবে। সমাজে এর প্রভাব কী সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।  যদি কোনও সংবাদকর্মী ভেবে চিন্তে এমনটা করেন, তাহলে গণমাধ্যম শুদ্ধ রাখার উপায় কী? আর সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম যদি আরও সচেতন না হয়ে থাকে তাহলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গণমাধ্যমের জায়গাটি দখল করে নেবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামে যদি ‘রাতের রানী’ হাইলাইট হয় তাহলে ‘রাতের রাজা’ কারা তাদের হাইলাইট করতে দোষ কোথায়? ‘রাতের রাজা’দের পরিচয় তুলে ধরার দায়িত্ব তাদের নিতে হবে যারা ‘রাতের রানী’ খুঁজে বের করেছেন। যদি খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে কি তাদেরও ‘রাতের রাজা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে? 

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার