মনোয়ারা ক্লার্ক 

মনোয়ারা ক্লার্ক 

মোহাম্মদ হরমুজ আলী

না, মনোয়ারা'র জায়গা হয়নি এ মাটিতে,
যে মাটির শৃঙ্খলমুক্তির যুদ্ধে তার মাকে থেতলে দেয়া হয়েছে
পাকি-উন্মত্ততায়, প্রথমে ধর্ষণে তারপর বেয়নেটে।

বঙ্গবন্ধুতো বলেই দিয়েছিলেন ওদের পিতার নামের জায়গায়
লিখে দাও আমার নাম আর ঠিকানা ৩২ ধানমণ্ডি ...

তারপরও ভিনদেশিদের নিয়ে যেতে হলো এদের
হলোনা থাকা মাতৃ জঠরে,
এক কোটি নাহয় উদবাস্তু ছিলাম আমরা 
বাকিরাওতো এগিয়ে আসিনি প্রসারিত হাতে
বুকে আগলে নিতে হাজার যুদ্ধশিশু!

বেয়নেটের দগদগে ঘা নিয়ে মনোয়ারা যখন কানাডায়
বেড়ে উঠছে পালক মা-বাবার শুশ্রূষায়
কিংবা অন্যকোথাও, অন্যকোনো মনোয়ারা 
আমরা কি একটিবারও ভেবেছি কেমন আছে তারা
নাকি আখের গোছানোর কুটিল চিন্তায় থেকেছি বিভোর!

মনোয়ারা স্বপ্নে দেখে মা তার ভয়ে দৌড়োচ্ছে দিকবিদিক
অনেক কষ্টেও মায়ের ছবি আঁকতে পারেনা সে
ডাক্তার বারন করেছেন স্বপ্ন দেখতে 
আহারে, মনোয়ারা কেমনে ঠেকাবে স্বপে মায়ের আসা-যাওয়া
যে মায়ের কোনো স্মৃতিই তার নেই শুধু লোকমুখে শুনা ধর্ষণ আর বেয়নেটের বিভৎসতা ছাড়া
সেই মা'ই এখন কেন্দ্রবিন্দু তার ভাবনা আর ভরসার।

ফুটপাতের ছিন্নমূল কুকুরটি মনোয়ারাকে ভীষণ টানে
ঝাপটে তুলে নেয় দুই হাতে 
হাহাকার করে উঠে বুকের পাজর
সে কি কুকুরের অসহায়ত্বে নিজেকে আর নিজের অসহায়ত্বে মা'কে আবিষ্কার করে!

মনোয়ারা খুঁজে দেশ, খুঁজে দেশের মাটি,
খুঁজে নির্ভরতার পরশ
একবার যায়, আরেকবার যায়, তারপর আবারও 
বিস্তীর্ণ দিকচক্রবালে খুঁজে ফিরে হারানো শিকড়
না, ধরাছোঁয়ার মাঝে আসেনা, বাইরেই থেকে যায় মায়ের ছবির মতো
নিদারুণ নিষ্ঠুরতায় খানখান হৃদয় 
অনিচ্ছায় ফিরে আসে জোরকরে গিলানো ভিন সভ্যতায়,
যেখানে আধা শতাব্দীর পরও সে বেমানান!

মনোয়ারাদের খুঁজবো হৃদ-কোণে দেশে দেশে 
ফিরিয়ে দিতে শিকড়ের সুখ
আর মাতৃ-পরিচয়ের অবিনাশী অধিকার,
বীরাঙ্গনার ঋণশোধে শাপমোচনের প্রার্থনা - জনকের জন্মশতবর্ষে। 

(১৯৭১ এর যুদ্ধশিশু মনোয়ারা ক্লার্ক এর প্রতি ভালোবাসার অর্ঘ্য)