ভাষ্কর্য বিরোধিতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

ভাষ্কর্য বিরোধিতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

মোহাম্মদ হরমুজ আলী 

অনেকটা দুদিলামো (দু'মনা) অবস্থায় আজকের এই লেখাটা শুরু করেছি। পাঠক ভাবতে পারেন এ আবার কেমন কথা! হাঁ, আমি স্বজ্ঞানেই দু'মনা কথাটা ব্যাবহার করেছি। গত সপ্তাহে 'পিনাকী আসলে কি চান' শিরোনামে আমার একটা লেখা ছাপা হবার পর আমি স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলাম তার কিংবা তার সাগরেদদের পক্ষ থেকে একটা একাডেমিক বিতর্ক আসতে পারে যদি ডালমে আসলেই কালা না থাকে এবং তারজন্য আমি আমার বিদ্যাবুদ্ধিমতো তৈরিও ছিলাম। কিন্তু পরিনতিতে যা দেখলাম তা দস্তুরমত অসুরীয় আস্ফালন। ডঃ পিনাকী আমার লেখার বিপরীতে যা বলেছেন তাতে আমার তেমন আপত্তি না থাকলেও তার সাগরেদরা যা দেখিয়েছে তা বর্ণনাতীত। গ্রামের ছেলে হিসেবে গালিগালাজের সাথে আমার একেবারেই যে পরিচয় নেই তা কিন্তু নয়, তবে আমার সকল দুর্ভাবনাকে অতিক্রম করেছে তাদের এই স্পর্ধা। আমার সহৃদয় পাঠকদের আশ্বস্ত কর‍তে চাই যে আমি খুব সচেতনভাবেই তাদের ফাঁদে পা দেয়া থেকে বিরত থেকেছি।

আপনারা ইতোমধ্যেই হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন, এই দীর্ঘ গৌর চন্দ্রিকার শানেনজুল কি! আমি সবিনয়ে সে কথায়ই আসছি। মূর্তি আর ভাষ্কর্য বিতর্কে দেশ এখন প্রায় উত্তালই বলা যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি সংস্কৃতি সহ এ'জাতীয় বিষয়গুলোতে যারা বিশ্বাসী তারাও তাদের মতো করে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য যে মূর্তি নয় তার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন এবং তাদেরকেও আমার মতো ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে! আর এখানেই আমার দু'মনা ভাবের কারন নিহিত। আমার ফেইসবুকের বন্ধুতালিকায় ৫০০০ বন্ধু আছেন। যাদের ৯০/৯৫ শতাংশই একই চেতনার অংশীদার বলে আমার বিশ্বাস। বাকি যে বন্ধুরা এসকল বিষয়ে লেখালেখি করছেন তাদের বন্ধুতালিকার ব্যাপারেও মোটামুটি একই কথা বলা যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের সেই বন্ধুদের সিংহভাগই নিরবতা পালন করছেন। তাদের এই নির্জীবতার জন্য কোনোভাবেই তাদেরকে দায়ী কিংবা অসম্মান করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে, জানতে খুব সাধ হচ্ছে - বিষয়টা কি? এটা কি সামগ্রিক চেতনার সংকট না একধরনের গা-সওয়া সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। প্রথমটা হলে আমার কিছুই বলার নাই আর যদি দ্বিতীয়টা হয় তবে আমার বলার আছে। 

আমরা সকলেই কমবেশি জানি যে আমাদের ভূখণ্ডের এই জনগোষ্ঠীর দুই-আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আমরা একটা জাতিরাষ্ট্রের মালিক হয়েছি। আমাদের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অগণিত মানুষ তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। বেশুমার মানবসন্তান জীবনের তরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। লাখো পারিবার তাদের একমাত্র কর্মক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে পথে বসেছে। এসবই আমরা জানি এবং এসকল ঘটনা যারা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন সেই প্রজন্ম এখনো জীবিত আছেন। আমাদের এই আন্দোলন, সংগ্রাম, জীবনদানে আমাদের দেশেরই একটা পক্ষ সশস্ত্র বিরোধিতা করেছে। তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি বরং আমাদের এই অর্জনকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য হেনো কাজ নাই যা তারা করছেনা। তাহলে এই গা-সওয়া ভাব কেনো? না-কি তারা ধরেই নিয়েছেন - এগুলো করে আর কী হবে! অনেকতো হলো! এবার একটু রিলাক্স করা যাক; সময়ে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আর আমার আপত্তি এখানটাতেই।

'৭৫ এর ১৫ই আগষ্টের পর সবকিছু এমনি-এমনি ঠিক হয়ে যায়নি। শুধু বিচার পাওয়ার জন্য পয়ত্রিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। জেল-জুলুম থেকে শুরু করে জীবনদানের মতো সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। দীর্ঘ একুশ বছরে এমন কোনো আওয়ামী পরিবার নেই যাদেরকে কোনো না কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িতদেরও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে এই আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে কম করে হলেও উনিশবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। সুতরাং কিছুই এমনি-এমনি ঠিক হয়ে যায় না।

পরাজয়ের প্রতিশোধ-পণে তারা জিঘাংসায় মাঠে নেমেছে। সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরা যেমন দেশের ভেতর থেকে তেমনি যুক্তরাজ্য সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ষড়যন্ত্রের তীর ছুঁড়ছে। হেফাজত-জামাততো মুখিয়েই আছে। আর সামনে আছে পালের গোদা তারেক জিয়া। এমতাবস্থায় নিরালায় বসে সুখস্বপ্নে বিভোর হবার সুযোগ কোথায়!

বঙ্গবন্ধুই যে তাদের ভয়ের মূল জায়গা এটা বারবার প্রমানিত হয়েছে। তাই ভাষ্কর্যে তাদের এতো রাগ। তারা জানে বঙ্গবন্ধুর যে কোনো ফর্মে উপস্থিতি বাঙালিকে সাহসী করে। বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ বাতিঘর বঙ্গবন্ধু। আন্দোলনে-সংগ্রামে-দ্রোহে, অন্যায়ে-অত্যাচারে-অমানবিকতায়, ত্যাগে তিতিক্ষায়-জীবনদানে, অর্থাৎ জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর কাছেই ছুটে। সুতরাং প্রতিমা আর ভাষ্কর্যে তফাৎ না বোঝার মতো বোকা মামুনুল হক কিংবা তার চেলা-চামুন্ডারা না। এটা সুদূরপ্রসারী গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। পানি মাপার মতো করে তারা এই এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। এটাতে কামিয়াব হলে এক-এক করে বাকিগুলো সামনে নিয়ে আসবে। এবং সবচেয়ে ভয়াবহ হবে যখন তারা নারী নেতৃত্বের হেফাজতি ব্যাখ্যা নিয়ে মাঠে নামবে। গত চল্লিশ বছরে এটা বারংবার প্রমানিত হয়েছে যে জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর শুধু রক্তের উত্তরসূরিই নয়, তাঁর চিন্তা-চেতনায়, মেধা-মননে, বিশ্বাস-আদর্শে, সাহস আর কর্মে তিনি বঙ্গবন্ধুর সত্যিকারের প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা আজ বাস্তবের দোরগোড়ায়। আর এ কারনেই শেখ হাসিনাকে আটকানো তাদের জন্য ফরজ হয়ে উঠেছে; সেটা যেকোনো ছলছুতোয়ই হোক। এখানে ভাষ্কর্য একটা উছিলা মাত্র।

যে কারনে আমি ভাষ্কর্য বিরোধিতাকে উছিলা বলছি তার ছোট্ট একটা উদাহরণ দিয়েই আমার কথা শেষ করবো - চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির শাপলা চত্তরে বঙ্গবন্ধু সহ জাতীয় চার নেতা, জিয়াউর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারবৃন্দ সহ প্রায় কুড়ি জনের ভাষ্কর্য আছে যা ২০১৩ সালের আগষ্টে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এই কুড়িটি ভাষ্কর্য নির্মানে কয়েক বছর সময় লাগে। হেফাজতি মামুনুল হকের বাবা মাওলানা আজিজুল হক তখন জীবিত, তিনি আগের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবিতাবস্থায় যেমন আমরা শুনিনি এই নির্মীয়মান ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে তাঁকে কিছু বলতে, ২০১৩ থেকে ২০২০, এই সাত বছরেও তার ছেলে মামুনুল হককে ঐ ভাষ্কর্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে আমরা শুনিনি। এখন কেউ যদি বলে যে জিয়াউর রহমানের ভাষ্কর্য নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নাই, যতো মাথাব্যথা বঙ্গবন্ধুর ভাষ্কর্য নিয়ে, তখন কিন্তু মামুনুল হককে আমতা-আমতা করা ছাড়া উপায় থাকবে না, যেমনটা তিনি সেদিন  করেছেন টেলিভিশনের ভাষ্কর্য বিতর্কে।

সুতরাং বন্ধুরা, একটু গা-ঝাড়া দিন। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে, যেখানে তাদের দস্তুরমত প্রশিক্ষিত জনবল সত্যকে মিথ্যার বেড়াজাল পরাতে আদাজল খেয়ে নেমেছে; বেহিসাব নগদনারায়ণ ছিটানো হচ্ছে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। সেখানে পাশ ফিরে সোবার কোনো সুযোগ নেই।