বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও 

বাংলাদেশ রুখিয়া দাঁড়াও 

৩১শে আগষ্ট '৭১ সাল। বর্ষাকালের সকাল আর দুপুরের মাঝামাঝি সময়। ছিরামিসি আমাদের গ্রাম থেকে দেড়-দুই কিলোমিটার দূরে হলেও মাঝখানে পুরোটাই ধানক্ষেত। দক্ষিণ দিক থেকে গুলির শব্দ শুনে গ্রামের প্রায় সকলেই বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমাদের ভরাং পারের পারিবারিক গোরস্তানের দেয়াল ধরে। ভয়ার্ত চোখ আটকে আছে ছিরামিসি গ্রাম আর আকাশের মাঝখানটায় যেখানে ধোঁয়ার কুন্ডুলি ইতোমধ্যেই জানান দিচ্ছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতম বর্বরতার। ঘন্টা দু-একের মধ্যেই লোকমুখে হতাহতের আর বাড়িঘর পোড়ানোর বিভিন্ন ধরনের খবর আসতে থাকলো। এর এক ফাঁকে আমার বড়ভাইও আগুনে পোড়া বিধ্বস্ত গ্রাম আর অগনিত মৃতদেহ দেখে এসেছেন। ঐ গ্রামে আমাদের ফুফুর বাড়ি যা তাঁর শশুর বাড়িও। সন্ধ্যার আগে বাবা বাড়িতে নিয়ে এসেছেন এক গুলিবিদ্ধ মুমূর্ষু মানুষকে। পরিচয় করিয়ে দিলেন - এই মানুষটি ছিরামিসি পোষ্ট অফিসের নাইট গার্ড, গুলিবিদ্ধ হয়ে ধানক্ষেত ধরে কোনোমতে আমাদের এদিকে আসতে দেখে মানুষজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তার যাবার জায়গা নাই। বরাবরের মতো বাবাই শেষ ভরসা। প্রথমে বাড়ি এবং গ্রামের লোকজন অজানা ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও বাবা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। আমাকে ডেকে বললেন - এই ভদ্রলোক তোমার সাথেই থাকবে, তার খেয়াল রেখো। তার শরীরে তিন জায়গায় গুলির আঘাত। সারারাত চিৎকার করে কাঁদতেন আর স্মৃতি থেকে কবিতা পড়তেন। তার চিৎকার আর অজানা আশংকায় আমারও ঘুম আসতো না। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে মানুষটি দিনদিন দুর্বল হয়ে যেতে লাগলেন। তিন-চার দিন এভাবে থাকার পর যখন তার জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে তখন তিনি বাড়ি চলে যেতে চাইলেন। চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারায় বাবাও রাজি হলেন। সমস্যা দেখা দিলো তাকে বাড়ি পাঠানো নিয়ে। শেষ পর্যন্ত বাবা এক সোয়ারী নাওয়ের মাঝিকে কোনোমতে রাজি করিয়ে তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। যতটুকু মনে পড়ছে তার বাড়ি ছিলো বালাগঞ্জের কাঠালখাই গ্রামে। তার সাথে আমাদের আর কোনোদিন দেখা হয়নি। সেদিন পাকিস্তানিরা প্রায় ১৩০ জন মানুষকে হত্যা করে আর কয়েক শত বাড়িঘর পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। আমার কৈশোরে ঘটা এই ঘটনাটি '৭১এর হাজারো ঘটনার একটি। আর অপরাধও একই - মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন।

সেদিন যাদের সরাসরি সহযোগিতায় এবং অংশগ্রহণে এমন হাজারো পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছিল তারাই আজ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। দায়িত্ব নিয়েছে এতদঞ্চলের সাড়ে সাতশত বছরের পুরনো মুসলমানদের আবারো নতুন করে মুসলমান বানাতে। এই বঙ্গীয় বদ্বীপের দুই-আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য আর জীবনাচরণের ধারাবাহিকতায় যে সংস্কৃতির বিকাশ, তা অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র ধর্মীয় অবগুণ্ঠন পরিয়ে আমাদেরকে  শিকড়হীন করার পায়তারায় মাঠে নেমেছে এই দুষ্টচক্র। ভুলে যাচ্ছে তাদের জ্ঞাতিভাই পাকিদেরও  একই কাজ করতে গিয়ে চব্বিশ বছরের মাথায় পাত্তাড়ি গোটাতে হয়েছিলো। 

স্বাধীনতার আকাঙ্খা জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সহজাত। স্বাভাবিকভাবে বাঙালিও এর বাইরে নয়। তাই অগনিত বছর ধরে সেই আকাঙ্খা পূরনে কতো বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে বাঙালি। স্বাধিকার আর স্বশাসনের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে এতকাল। পাকিস্তান আন্দোলনকেও একসময় নিজেদের স্বপ্নপূরণের সারথি ভেবে সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে; আলোর দেখা মেলেনি, আলেয়াই ভবিতব্য হিসেবে সামনে এসেছে।

সেই ভগ্নমনোরথ জাতিকে পথের দিশা দিলেন বঙ্গবন্ধু, আস্তে আস্তে গড়ে তুললেন ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তায়, এগিয়ে গেলেন স্বপ্নপূরণের পথে। বাঙালি রক্ত, সম্ভ্রম সবই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে সেই কাঙ্ক্ষিত সফলতার জন্যে। অবশেষে ধরা দিয়েছে সেই চির অধরা; বাঙালি মানচিত্র পেয়েছে, পেয়েছে স্বাধীনতা। 

জাতির কাছে জনকের অঙ্গীকার ছিলো স্বাধীনতার সাথে অর্থনৈতিক মুক্তির। বঙ্গবন্ধু কন্যা সেই অঙ্গীকার পূরনের যখন দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই তারা আবার পুরোনো রূপে আবির্ভূত হয়েছে। লক্ষ্য তাদের একটাই - এ জাতিকে তারা মাথা উঁচু করে বিশ্বসভায় দাঁড়াতে দেবেনা। 

আমাদের স্বাধীনতা আজ সুবর্ণ জয়ন্তীর দোরগোড়ায়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এই পঞ্চাশটি বছর জাতির এগিয়ে যাবার বিরুদ্ধে যতো ষড়যন্ত্র হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে এই গোষ্ঠী কখনো সামনে থেকে, কখনো পিছনে থেকে শক্তি যুগিয়েছে। জাতির স্বপ্ন পূরন বাধাগ্রস্ত করেছে। '৪৭ এর চেতনা থেকে তারা কখনো সরে আসেনি। বাঙালির জাতিগত সহজাত চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা তাদের মূল শত্রু। তাদের আন্তর্জাতিক মোড়লদের দেয়া প্রেসক্রিপশন আর লন্ডন ভিত্তিক ষড়যন্ত্রের ভ্রষ্ট খলনায়ক তারেকের হয়ে তারা খেলছে। এখানে পবিত্র ইসলাম ধর্ম বা মুসলমানিত্বের যে বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটা নেই তা আমরা যেমন জানি, তারাও জানে। তারপরও নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কেল্লা ফতেহ করতে চাইছে।

তিরিশ লক্ষ শহীদ আর দু'লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের কাছে বাঙালির রক্তঋণ - একটি গনতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। এই ঋণশোধে জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে সকল বাঁধা অতিক্রম করে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের স্বপ্ন-সাধ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ টিকে থাকবে পৃথিবীর সমান বয়সী হয়ে - বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর আমাদের সুবর্ন জয়ন্তীতে এই হোক অঙ্গীকার।

লেখক : রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট।