বঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ ও সিলেট

বঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ ও সিলেট

মোঃ চন্দন মিয়া

প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাস বৈচিত্র্যময় । বিজাতীয়রা এই দেশ শাসন করেছেন দীর্ঘ কাল। শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল না। শাসক পরিবর্তনের সাথে জনগনের জীবন মান ও আর্থ-সামাজিক  অবস্থার কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায় নি। তাই শাসকশ্রেনীর সাথে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তাই পাল, সেন, তুর্কি মোঘল কে,  কখন ক্ষমতায় আসলো জনগনের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। বলা চলে শাসক শ্রেণীর মধ্যে তলোয়ার যুদ্ধে যে জয়ী হতো, সে'ই মসনদে আসীন হতো। জনগণ অনেক সময় দর্শকের ভূমিকাই পালন করতো।


 প্রাচীন কালে 'বাংলা' নামে কোনো বিস্তৃত অঞ্চল ছিল না। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এই বাংলা  ছোট ছোট নৃপতি শাসিত স্বাধীন জনপদ ছিল। যেমন বঙ্গ, গৌড়, বরেন্দ্র, সমতট ,হরিকেল ইত্যাদি । এই অঞ্চল সর্ব প্রথম ১৩৪২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমলে স্বাধীন অঞ্চল হিসাবে বাংলা  প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অবিভক্ত বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ছিলেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। প্রথমে 'বাংগেলা' নামে অভিহিত হয়, পরবর্তীতে আগত পর্তুগিজরা উচ্চারনের কারনে বলতো 'বেংগালা' , ইংরেজরা বলতো 'বেঙ্গল' এই ভাবেই নামটি হয় 'বাংলা'। আইনি আকবরি গ্রন্থের মতে 'আল' দিয়ে জমি জমা বিভক্তির কারনে প্রাচীন নাম 'বঙ্গ' এর সঙ্গে 'আল যুক্ত হয়ে বঙ্গাল নাম ধারন করে অর্থাত্ (বঙ্গ+আল) বঙ্গাল। (তথ্য: স্বাধীনতা- সশস্ত্র সংগ্রাম ও আগামীর বাংলাদেশ) বাঙালি জাতি ও  বাংলা ভাষা ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে 10th century-র পর।  যার প্রমান পাওয়া যায় নিতিষ সেন গুপ্তের একটি বইয়ে।Nitish sengupta বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষা সম্পর্কে  তাঁর 'land of two rivers' গ্রন্থে বলেন-- " The Bengali race and Bengali language both emerged in history only after the tenth century AD. According to UN record, Bengali, in terms of the number of speakers claming it , was the to be their mother tounge, was the sixth among the spoken languages in the world".

রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর ৭৫০ সালে পাল বংশ ক্ষমতায় আসে । পাল বংশ শাসন করে চারশত বৎসর।পাল বংশের পর সেনরা শাসন করে এই বাংলা। সেনরাই মূলত প্রথম বিদেশী শাসক। মধ্য যুগে মুসলিম শাসকদের আবির্ভাব ঘটে। বাংলা  মুসলিম শাসক কর্তৃক শাসিত হলেও হিন্দু- মুসলিম সম্প্রীতি  ছিল বিদ্যমান । হিন্দু- মুসলিম পাশা পাশি অবস্থান করার ফলে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য  অটুট থাকে। ইংরেজদের আগমন ঘটে কলিকাতাতেই প্রথম। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার  উদ্দেশ্যে কলিকাতাই প্রথম প্রবেশ করে। বঙ্গ ভঙ্গ রদের পর বৃটিশরা রাজনৈতিক কারনে শক্ত হাতে ভারত শাসনের লক্ষ্যে কলিকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত করে। যার কারন ছিল অনেকটা রাজনৈতিক । আর তাই নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু তাঁর 'The indian struggle' গ্রন্থে লিখেন এই ভাবে--" Viceroy lord hardiinge, who was largely responsible for this arrangement, as also for the transfar of the capital of india from calcutta to Delhi. lord hardinge had a wonderful historic sense and he thought that by these measures British rule would be more firmly installed in India".

১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ হলে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি প্রভিন্স করা হয়। দীর্ঘ দিন নির্বাসিত থাকা সিলেট পূর্ব বঙ্গে স্থান পায় । একই ভাষাভাষী প্রভিন্সের সাথে যুক্ত হতে পারা সিলেট বাসীদের জন্য ছিল  আনন্দের। সর্ব প্রথম বাংলা ভাষী সিলেট , কাচার ও গোলপারা আসামে যুক্ত হয় ১৮৭৪ সালে। বঙ্গভঙ্গ হলে কংগ্রেস ও হিন্দু শ্রেনী  বিরোধীতা করে।  ।কংগ্রেসের  চাপের মুখে  ইংরেজ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়।

বঙ্গ ভঙ্গ রদের ফলে  সিলেট আবারও  আসামে চলে যায় । যেভাবে বিহারে চলে যায় ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে বাংলা ভাষী মানবাম ও ডালবাম । Nitish sengupta এর 'land of two rivers' গ্রন্থে যার উল্লেখ রয়েছে।বঙ্গভঙ্গ রদ পূর্ব বঙ্গ ও বাংলা ভাষী সিলেটের জন্য সত্যিই দুঃখের। পরবর্তীতে দ্বিজাতি তত্ত্বের  ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে  ভারত - পাকিস্তান দু'টি রাষ্ট্র হলে , সিলেট অঞ্চলের মানুষ রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয় ।

রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভৌগলিক সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনে বঙ্গ বদল হয়েছে ইতিহাসের পরিক্রমায় কয়েকবার । ভৌগলিক এই বিভাজন কখনও কাম্য আবার কখনও ছিল নেহায়েত রাজনৈতিক। এই বিভাজন বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি  ও বাঙালিত্তে  বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে নি। দীর্ঘ দিন মুসলিম শাসনের ফলে হিন্দু- মুসলমানের মিলিতভাবে সৃষ্ট সংস্কৃতি একটি  যৌথ ও  বিশেষ সাংস্কৃতিক রূপ উম্মীলিত হয় । বঙ্গ থেকে  সিলেটের নির্বাসন ছিল অনেকটা আত্মঘাতী । কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন--" মমতা বিহীন কালস্রোতে বাংলার প্রান্ত সীমা হতে একদা নির্বাসিতা শ্রী ভূমি শ্রীহট্ট "।


লেখকঃ কলামিষ্ট, প্রাক্তন প্রভাষক ।