পিনাকী আসলে কি চান!

পিনাকী আসলে কি চান!

মোহাম্মদ হরমুজ আলী

ইদানীং আমার নতুন এক মাথাব্যথা শুরু হয়েছে - নাম ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য! জন্ম ১৯৬৭ সাল। সে হিসেবে আমার ১০ বছরের ছোট। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ১৪ আর তিনি ৪। বই লিখেছেন 'স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ' নামে। যতোটুকু জানা যায় প্রিন্ট হয়েছে লন্ডনে আর মোড়ক উন্মোচন প্যারিসে।  তার প্রজন্মের মানুষেরা মুক্তিযুদ্ধ/স্বাধীনতা নিয়ে লিখবেন এটা তো খুবই ভালো খবর। তারা যেমন মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে লিখবেন, মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময় নিয়েও লিখবেন এবং আরো লিখবেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। প্রত্যাশাও তাই। তবে এখানে একটা শর্ত আছে - মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে লিখতে গেলে তার পূর্ববর্তী এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে ধারণ করতে হবে প্রথম। নাহয় লেখক পার পেয়ে গেলেও পাঠকের বিড়ম্বনার শেষ থাকবে না। আমার এতো কথার শানেনজুল হচ্ছে, আমি তাকে একজন ব্লগার হিসেবেই জানতাম, তার কিছু লেখাও পড়েছি। বেশ করিতকর্মা পুরুষ। প্যারিসে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল অর্জন সহ ইত্যাকার বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি ইউটিউবে বিষোদগার করছেন না। তার এই ক্যাম্পেইনের সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বই ছাপানো। তাতেও খুব বেশি আপত্তি থাকতো না কারণ এই মেঘা প্রকল্পে যে পরিমাণ ইনভেস্ট করছে '৭১ এর পরাজিত শক্তি, '৭৫ এর খলনায়ক আর তাদের বশংবদরা, যেকোনো ব্যবসায়ী-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষই টেমটেড্ হবে যদি আদর্শের জায়গাটা পরিস্কার না থাকে। এটা একটা পুরনো খেলা। আমাদের স্বাধীনতার পর 'পুর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি' নামে লন্ডনে পালিয়ে থাকা গোলাম আজম, চৌধুরী মঈন উদ্দিনদের সলাপরামর্শে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত কিছু পাকি-জাত বাঙালি কুলাঙ্গারদের নিয়েও চেষ্টা করা হয়েছিল। না, রক্তের আকরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পুর্ব পাকিস্তান হয়নি যদিও ক্ষতি যথেষ্ট হয়েছে। হয়তো অন্যান্য ষড়যন্ত্রের মতো এটাও আরেকটা ষড়যন্ত্র ভেবে হজম করে যেতাম। কিন্তু যখন দেখলাম কিছু সাংবাদিক এবং আওয়ামী ঘরানার লোক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে খুব স্বাচ্ছন্দবোধ করেন, এমন কিছু আবালও বই হাতে নিয়ে বেশ পুলকিত পোজ দিচ্ছেন, তখন থেকেই মাথাটা ঝিমঝিম করতে শুরু করলো। 

খোঁজ নেবার চেষ্টা করলাম কে এই পিনাকী? শুরুটা নাকি বামপন্থী হিসেবে, শাহবাগের গনজাগরণ মঞ্চের দিনগুলোতে বেশ তৎপর ছিলেন, একটা সময় আওয়ামী ঘরানায়ও বেশ যোগাযোগ ছিলো। এই সুযোগে টাকাপয়সাও বেশ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে চাউর আছে। এখন দায়িত্ব নিয়েছেন উগ্র মৌলবাদীদের মুখপাত্র হিসেবে, সংখ্যালঘুদের বিনাশ সাধনই তার ব্রত; তার নাম কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারনে এই কাজটা বেশ বাজারও পাচ্ছে। একই অঙ্গে এতো রূপের সমাহার যেখানে, সেখানে ঐ বিশেষ ইনভেস্টাররা পয়সা খাটাতে পেছনে তাকাবে কেনো!

এখন ফিরে যাই শুরুতে বলা তার-আমার বয়সের কথায়। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, বুঝার এবং মনে রাখার বয়স ছিলো; তারা প্রত্যক্ষ করেছি কি করে বাঁশের কঞ্চি হাতে কারখানার শ্রমিক, ক্ষেতের কৃষক কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেরা দাঁড়িয়ে গেছে পাকিস্তানি সৈন্যের উঁচিয়ে থাকা চাইনিজ রাইফেলের সামনে। কি করে লুণ্ঠিত হবার সমুহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সম্ভ্রম হাতের মুঠোয় নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে বস্তির পড়াশোনা না জানা মেয়ে থেকে শুরু করে সুন্দর আগামীর স্বপ্নে বিভোর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকা মেয়েটি কিংবা সংস্কারের কারনে বাড়ির উঠোন পার হয়নি যে মেয়েটি কোনদিন, সে-ও। মুখে আর বুকে আওয়াজ একটাই - জয়বাংলা। কোথায় পেলো এরা সে অমিয় শক্তি? কি ঘটে গেছে তাদের আর তাদের পুর্বপুরুষের উপর দিয়ে গত চব্বিশটি বছর। কোন স্বপ্নে উদ্ভাসিত আজ তাদের এই রুদ্ররূপ! এই বিষয়গুলোকে আমাদের প্রজন্ম ধারন করতে পেরেছিলো, অগ্রজরা তো অবশ্যই। ৪ বছর বয়সের পিনাকীর পক্ষে সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব ছিলোনা। তাই এতো ঘনঘন রূপ পালটানো।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তার 'স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ' বইতে '৭৫ এর ১৫ই আগষ্টকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করেছেন কিংবা ৩রা নভেম্বরকে? এমনকি ৭ই নভেম্বরকে? ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, জিয়ার অবৈধ ক্ষমতা গ্রহন, জাতির জনকের হত্যাকারীদের পুনর্বাসন, জিয়ার হাঁ-না ভোট, প্রলোভন আর ভয় দেখিয়ে প্রায় সবক'টি বিরোধী দলকে ভেঙ্গে খানখান করে দেয়া, হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে জেল-জুলুম থেকে শুরু করে হত্যা নাহয় জীবনের মতো পঙ্গু করে দেয়া, বিভিন্ন ছলছুতোয় মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, রাজাকারদের পুনর্বাসন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বঘোষিত রাজাকারদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বানানো, মুক্তিযুদ্ধের রক্তে লেখা জাতির রক্ষাকবচ প্রিয় সংবিধানকে নিজের সুবিধার জন্য কেটেছেঁটে জর্জরিত করে দেয়া, এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর তিনি কিভাবে দিয়েছেন; নাকি সেটাও তার বর্তমান এমপ্লোয়ার জামাত-বিএনপির প্রেসক্রিপশনে! আমি বিরোধী মতের বিপক্ষে নই, তবে জাতির আবেগ আর অনুভূতির শ্রেষ্ঠতম ঠিকানা মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করার প্রয়াস আমার কাছে বিরোধিতা নয় কুটিলতা; আমি তার বিরুদ্ধে। 

বইপড়া দোষের নয়। জ্ঞানর্জনের জন্য অবশ্যই বই পড়তে হবে তবে বিভ্রান্তি চড়াবার মানষে লিখিত পুস্তিকা/পামফ্লেট থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। নাহয় লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। 

পরিশেষে, আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রথিতযশা সাংবাদিক/কলামিস্টদের অনুরোধ করবো - ডাঃ পিনাকী যখন রোগী রেখে জাতির নাড়ী দেখতে উদ্ধত হয়েছেন (মহান ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিতদের প্রতি সন্মান রেখে), তখন ভূল ডায়াগনোসিসের সম্ভাবনাই বেশি, সুতরাং পিনাকী ডাক্তারের স্বরূপ উন্মোচনে এগিয়ে আসুন; বিপদ সর্বগ্রাসী হবার আগেই।