তাপস প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেছেন

তাপস প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেছেন

মোহাম্মদ হরমুজ আলী

শেখ ফজলে নুর তাপসের বক্তব্য বারকয়েক শুনলাম, ঘোরলাগা আচ্ছনতায়। তাপস যখন ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য যুক্তরাজ্যে আসেন তখন তার সাথে প্রথম পরিচয়। পূর্ব লন্ডনের খ্রিস্টিয়ান স্ট্রিটে একটা ফ্লাট ভাড়া নেওয়া হবে তারজন্য, সেটা দেখতে গিয়েছিলাম, যতটুকু মনে পড়ে ভাবিও (শেখ সেলিম ভাইয়ের স্ত্রী) সাথে ছিলেন। খুবই শান্ত, কম কথা বলা কৈশোর উত্তীর্ণ যুবক। চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় একধরনের ভাবালুতা মাখানো দৃঢ়তার স্পষ্ট দীপ্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

সেই তাপসকে আজকে দেখলাম অন্যরূপে। প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যখন অন্য অনেকেই কথা খুঁজে পাচ্ছেননা কিংবা মুরোদে কুলোচ্ছেনা। জাতীয় জীবনে কিছু কিছু সময় আসে যখন অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়, তাপস তা-ই করেছেন প্রচন্ড দৃঢ়তায় এবং বিদগ্ধ শব্দচয়নে। পাঠক খেয়াল করলে দেখবেন, তিনি একেবারেই ব্যবহারিক ভাষায় হৃদয় থেকে উচ্চারণ করেছেন তার বিশ্বাস আর অঙ্গীকার। কোনো ভনিতা নেই কোথাও। 

তাপসের বাবা শেখ ফজলুল হক মনি, ষাটের দশকের অগ্রগণ্য ছাত্রনেতা এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতার অন্যতম আর্কিটেক্ট। মহান মুক্তিযুদ্ধে বি এল এফ বা মুজিব বাহিনীর প্রধান। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে যুব আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং তাঁর সময়ের সবচেয়ে মেধাবী ও সাহসী যুবনেতা, প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং দার্শনিক। পচাত্তরের ১৫ই আগষ্টে বঙ্গবন্ধুর সাথে যখন শেখ মনিকেও হত্যা করা হয় তখন তাপস চার বছরের শিশু। তার অন্তঃসত্ত্বা মা-ও ঘাতকের গুলি থেকে রক্ষা পাননি। এই তাপস যখন আদর্শের জায়গা থেকে কথা বলেন তখন এর গুরুত্বই অন্যরকম।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর কোনো বিচারেই কম সময় নয়। এই পুরো সময়টা ধরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী হেনো কাজ নেই যা এই ঘাতক চক্র করেনি। আমরা সহ্য করে গেছি, আমরা সকল মত এবং পথের মানুষদের নিয়ে সহাবস্থানের কথা বলেছি, সর্বোপরি আমরা একটা গনতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্টার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঐ প্রচলিত বাগধারার মতো চোর ধর্মের কাহিনীতে কর্ণপাত করেনি। তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের সেই বিখ্যাত তর্জনী ভেঙে ফেলেছে, যে তর্জনীর ঝিলিকে শান্তিপ্রিয় বাঙালি এক লহমায় যোদ্ধার জাতিতে পরিনত হয়েছিল।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল চালিকা শক্তি ধর্মনিরপেক্ষতা, যে চেতনায় এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষ স্ব স্ব ধর্মীয়বোধের উর্ধ্বে উঠে নিজেদের মধ্যে এককেন্দ্রিকতা অনুভব করে। সমতার সুমধুর বানী ছড়িয়ে দেয় হৃদয়-মনে। মানুষে মানুষে বিভাজন আর কুটিল শ্রেষ্ঠত্ব দূরীভূত হয়। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে সেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে টার্গেট করেছে। তারা জানে ধর্মনিরপেক্ষতাবোধকে উপড়ে ফেলতে পারলে জাতীয়তাবাদ মুখ থুবড়ে পড়বে। আর তখনই তারা কামিয়াব হবে পাকি-আদর্শ ছড়িয়ে দিতে। তাই, তাদের যতো রাগ তা এই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি। 

সুতরাং, সময় এসেছে উচ্চকণ্ঠ হবার। তাপস ঠিকই বলেছেল "শেখ হাসিনা আছেন বলেই আপনারা এখনো আছেন"। আমি তাপসের কথায় আবারও ফিরে আসি, তাপস বলেছেন "গৃহযুদ্ধের ভয় দেখাবেন না আমাদের, চাইলে সাতদিনও লাগবেনা, তুরুপের তাসের মতো উড়ে যাবেন"। ঠিকই তো - যে বাঙালি উনসত্তরে আইয়ুবের বিরুদ্ধে গন অভ্যুত্থান করেছে, যে বাঙালি সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ভোট বিপ্লব করেছে, যে বাঙালি একাত্তরের সাতই মার্চে লাটি হাতে জানান দিয়েছে স্বশাসনের, যে বাঙালি পঁচিশে মার্চে দাঁড়িয়ে গেছে পাকি-কামানের বিরুদ্ধে - তাদেরকে গৃহযুদ্ধের ভয় দেখান! আহাম্মক না ভণ্ড! 

সকল আস্ফালনেরই একটা সীমা আছে, সুতরাং সাবধান হয়ে যান, এমনোতো হতে পারে শেখ হাসিনার কর্মীরাই একসময় নেত্রীর কথার অবাধ্য হতে বাধ্য হবে।

লেখক : কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ।