জীবন-যুদ্ধ জয়ের গল্প::

একজন আদর্শ শিক্ষকের ইতিকথা

একজন আদর্শ শিক্ষকের ইতিকথা

শাকির আলম কোরেশী 

কিছুটা অনুশোচনা থেকেই আজকের এ লেখাটি।
কারণ, ইতিপূর্বে কখনো তাকে নিয়ে লেখা হয়নি। স্মার্ট ফোন তো দূরে থাক, মোবাইল ফোনও বোধহয় তখন বাজারে আসেনি। আর সোশ্যাল মিডিয়া বলতে কোন কিছু তেমন ছিল বলে মনে হয়না। তাই সেরকম তাকে নিয়ে কোন স্মৃতিচারণ করার সুযোগ কারো কখনো হয়নি। তবে পরিবারে যে কোন হৃদয়-বিধারক চিরবিদায়ে স্মৃতির আলোচনায় যার নাম সবার আগে সব সময় চলে আসে, তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় বড় চাচা জনাব ইলিয়াস হোসেন কোরেশী। যিনি এলাকায় ইকবাল মাস্টার নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন।


আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর পূর্বে আটারো জুনের ঠিক এমনি এক দিনে আমাদের সবাইকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি দেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জীবন যুদ্ধে জয়ী আমাদের প্রিয় বড় চাচা জনাব ইলিয়াস হোসেন কোরেশী।


মাত্র তের বছর বয়সেই পিতৃহারা হন তিনি। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাবস্থায় পিতার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে ছোট তিন ভাই ও এক বোনের দায়িত্ব নিতে হয় কাঁধে। গত ৪ঠা জুনে মৃতু্যবরণকারী সবচেয়ে ছোট ভাই ড. সিরাজুল ইসলাম কোরেশীর বয়স ছিল তখন মাত্র ছয় মাস। চার বছর বয়সী একমাত্র বোন, আর আট বছর বয়সী অপর ভাই যিনি এগারো বছর বয়স পর্যন্ত বাকপ্রতিবন্ধী ছিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া ইমিডিয়েট ছোট ভাই মরহুম ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন কোরেশীকে সাথে নিয়ে জীবন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। সাময়িকভাবে লেখা পড়া বন্ধ হয়ে পড়ে উভয়েরই। প্রায় বছর খানিক লেগে যায় শোক কাটিয়ে উঠতে। মরহুম পিতার রেখে যাওয়া বেশ জমিজমাকেই ভর করে প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে উঠার চেষ্টা করেন। বর্গাচাষিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত ধানই ছিল তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। বন্যা, খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ঘটলেই জমিজমা বিক্রি করে সংসার চালানো ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না তখন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে Bengal famine খ্যাত দুর্ভিক্ষের শুরুতেই কৃষিজমি বিক্রি করে করে ঠিকে থাকার চেষ্টা করেন। একদিকে খাদ্য ঘাটতিতে দুর্ভিক্ষের দিকে যাচ্ছে দেশ, অন্য দিকে দুনিয়ার তাবৎ মোড়লদের আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্রের ঝনঝনানি, একে অন্যের প্রতি হুমকি ধামকিতে বাতাসে যেনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুঞ্জন। ইতিমধ্যে বিশ্ববাণিজ্যে নৌপথে আমদানি রপ্তানিতে একে অন্যের গতিরোধ, অবরোধ ও পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞায় খাদ‍্য ঘাটতি সর্বত্র। প্রাকৃতিক দুর্যোগ,খাদ্য ঘাটতি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমূহ সম্ভাবনায় দ্রব্য মূল্যের চরম উর্ধগতিতে ভারতবর্ষের নিম্ন আয়ের মানুষের মতো দ্রুতই যেন সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়তে থাকেন। গতর খাটিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার বয়স না থাকলেও কি হবে, বাইছা হাওরে জমি তো আছে। বিক্রিতে ছোট ভাইয়েরও দ্বিমত নেই। শত প্রতিকূল পরিবেশেও রক্তে প্রবাহিত জ্ঞানার্জনের পিপাসা তাদেরকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ করে তোলে। অনিয়মিতভাবে হলেও নিজে বজ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মিডল স্কুল সার্টিফিকেট সমাপ্ত করে তখনকার পারিপার্শিকতায় কিছু একটা করার চেষ্টা করেন। অত্যন্ত মেধাবী আমাদের এই বড় চাচা পিতার জীবদ্বশায় প্রাথমিকে মডেল বৃত্তি পরীক্ষায় ডিস্ট্রিক স্কুল বোর্ডে সেরা হয়েও জেলা শহরের হাই স্কুলে সেকেন্ডারি পড়ার অনুমতি মিলেনি পিতার কাছ থেকে। পিছনের চরম হৃদয়-বিধারক কিছু মৃত্যু ঘটনায় পিতা মৌলবী মামুর আলী কোরেশী কোনভাবেই নিজেকে মানাতে পারেননি ভাল শিক্ষার জন্য দূরের কোন প্রতিষ্ঠানে টিনেজ ছেলেকে নিজের চোখের আড়াল করতে। কেননা পরিবারে অতীত কিছু মর্মান্তিক অকাল মৃত্যু ঘটনা তাকে অজানা আতঙ্কে বিপর্যস্ত করে তুলে। খুবই অবুঝ বয়সে মহামারীতে সিলেট শহরতলির প্রাচীন এক মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র আপন বড়ভাইকে হারিয়েছেন পিতা জনাব মৌলভী মামুর আলী। যে কারণে উনার বাবা মৌলভী রইস আলীও তাকে দূরে কোথাও গিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে অনুমতি দেননি। ইতিমধ্যে অত্যন্ত মেধাবী উনার বড় ছেলে বশির আহমদ কোরেশী পাইলগাঁও বি,এন স্কুল থেকে ১৯৩৫ সনে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পরেই মহামারী কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম বিভাগে উত্তীর্ন তরুণ পুত্র বশির আহমেদের অকাল মৃত্যুতে অত্যন্ত বিপর্যস্ত পিতা মামুর আলী কোরেশী অনেকটাই ভেঙে পড়েন। ভাগ্যের নির্মমতায় প্রথম সন্তান তার রেজাল্ট না শুনেই অপ্রত্যাশিত ভাবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়াটা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেননি পিতা মামুর আলী। যে কারণে অত্যন্ত প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও জনাব ইলিয়াস হুসেন কোরেশী পিতার ইচ্ছার বাইরে গিয়ে ভাল শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত জেলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি নেননি।


সংসারের বড় ছেলে হিসেবে ব্রিটিশ আমলেই পিতার অর্বতমানে বহুল উচ্চারিত এন্ট্রেন্স পাশের যোগ্যতায় তরুণ বয়সেই সরকারি স্বীকৃত প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরী জীবন শুরু করেন এবং ইমিডিয়েট ছোট ভাই আরেক মেধাবী ছাত্র জনাব মকবুল হুসেন কোরেশীকে সিলেটে দূর সম্পর্কের এক আত্বীয়ের বাসায় লজিং দিয়ে সিলেট ডিস্ট্রিক হাই স্কুল, বর্তমান সিলেট গভঃ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করেন। এবং এই স্কুল থেকেই আমাদের মেঝ চাচা জনাব মকবুল হোসেন কোরেশী উনিশো তেতাল্লিশ ইংরেজিতে কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক পাশ করেন। পিতার অকাল মৃত্যুর পর এভাবেই তারা জীবন যুদ্ধে অবতীর্ন হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এদিকে বাড়িতে ছোট ছোট ভাই বোনকে নিয়ে মমতাময়ী মা অনেকটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুঃচিন্তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখনকার দিনে আরবি, ফার্সি লেখা পড়া জানা জন্মধাত্রি মা যেন চোখের সামনেই ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলছেন। পরিবারের স্বার্থেই অসুস্থ মা ও ছোট ভাই-বোনদের কথা মাথায় রেখে মাত্র একুশ বছর বয়সে গ্রামেরই প্রখ্যাত স্কুল শিক্ষক জনাব সৈয়দ হাফিজুর রহমান (আফিল মাস্টার)ও স্কুল শিক্ষিকা মিসেস সৈয়দা দিল আফরুজ (মরহুম জনাব এহিয়া মৌলভীর পিতা-মাতা ) দম্পতির একমাত্র মেয়ে সৈয়দা হুসনে আরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ব হন। জনাব মরহূম এহিয়া মৌলভী সম্ভবত যুক্তরাজ‍্যস্থ সৈয়দ পুর সামছিয়া সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সৈয়দ পুরের প্রথম নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাইনর মডেল গার্লস প্রাইমারি স্কুল তাদের বাড়িতেই উনার পিতা জনাব হাফিজুর রহমান আফিল মাস্টার এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ আমলেই গণশিক্ষা ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুদানপ্রাপ্ত হয়ে পরিচালিত স্কুলটি তাদের মৃত্যুর পর এক সময় পরিচালনার এভাবে বন্ধ হয়ে যায়।


দেশ বিভাগের পরই গঠিত মৌলানা আকরাম খাঁন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক সরকার প্রাথমিক স্কুল ও প্রাইমারি শিক্ষা বাধ্যতামূলকসহ শিক্ষা ব্যাবস্থা উন্নতি করণে প্রাইমারি স্কুলের ফুলগ্রেড প্রধান শিক্ষকের নুন্যতম যোগ্যতা মেট্রিকুলেশন করলে ভারত বিভক্তির পরপরই নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষাবোর্ড থেকে দীর্ঘ বিরতির পর চাকরিরত অবস্থায় জনাব ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী প্রাইভেট মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ন হন এবং পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ফুল গ্রেডেড প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

এক সময়ের কৃতি ফুটবলার, ক্রিয়া সংগঠক জনাব ইলিয়াস হোসেন কোরেশী বৃহত্তর জগন্নাথপুর এলাকা জুড়ে একজন মেধাবী তরুণ স্কুল শিক্ষক হিসেবে তখন খ্যাতি অর্জন করেন। বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী বৃত্তি পরীক্ষায় তার স্কুলের বৃত্তি প্রাপ্তির বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত বিষয় হিসেবে থানা ব্যাপী শিক্ষক সমাজে তখন আলোচিত ছিল। জগন্নাথপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আবু খালেদ চৌধুরীর আপন চাচা, এক সময়ের বি.এন.পি নেতা জনাব আনিসুল বারী চৌধুরীর পিতা সুনামগঞ্জ লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ (এম এল এ) সদ‍স‍্য জনাব আব্দুল বারী চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্টিত তার গ্রামের বাড়ি প্রাইমারি স্কুল সরকারিকরণ হলে খ্যাতিমান মেধাবী শিক্ষক জনাব ইলিয়াছ হোসেন কোরেশীকে নিজ বাড়িতে লজিং দিয়ে সেখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে বদলি করে নেন এবং তার প্রচেষ্টায় অল্প দিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি তখনকার সময়ে এলাকার একটি শ্রেষ্ঠ প্রাইমারি স্কুল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।

ইতিমধে‍্য কন‍্যা সন্তানের জনক বনে যাওয়া ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী নারী শিক্ষার বিযয়টি ভাবতে শুরু করেন। আশারকান্দি প্রাইমারি স্কুলে থাকাকালীন সময়েই তিনি এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রাইমারি পর্যায়ে স্কুল প্রতিষ্টার উদ্যোগ নেন। বেশ আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়া নিজের শশুর-শাশুড়ি দ্বারা পরিচালিত গার্লস মডেল প্রাইমারি স্কুলের অনুকরনে আমাদের বাড়িতেই নতুন একটি গার্লস প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্টা করেন। নামে মেয়েদের জন্য প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও এলাকার ছেলে মেয়েরা একসাথে এখানে লেখাপড়া করতো। সামান্য পকেটমানি দিয়ে দু'একজন শিক্ষক রাখলেও অধিকাংশ সময় আমাদের মা চাচীরা স্বেচ্ছাশ্রমে শিশুদের কে পাঠদান করতেন। কিছু দিন কোরেশী বাড়ীর শিপন-হিরণের আম্মা আমাদের দিলারা ফুফুও এখানে শিক্ষকতা করেন।


পুর্ব ও পশিচম পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন বৈষম্য নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঊত্তেজনা দেখা দিলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আয়ুব খানের সরকার উভয় পাকিস্তানের বৈষম্যের ক্ষেত্র চিহ্নিতকরনে তখনকার জাদরেল সিএসপি অফিসার, পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস অফিসার্স এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল জনাব এএমএমুহিতের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করলে শিক্ষাক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের পিছিয়ে পরার বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেযভাবে গুরুত্ব পায়। তখনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষোভের বিষয়টি প্রশমিত করতে প্রদেশিক সরকার কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বেশ সংখ‍্যক প্রাইমারি স্কুল পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠার উদে‍্যগ গ্রহন করে। এই সুযোগেই জনাব ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী নিজের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বাড়িতেই পরিচালিত বালিকা স্কুলকে সরকারিকরনের উদে‍্যগ গ্রহন করেন। প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ে একক লিঙ্গের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সরকারি কোন নীতিমালা না থাকায় বাধ‍্য হয়েই সাধারন স্কুল হিসেবে জাতীয়করনের জন‍্য নিবন্ধনের আবেদন করেন। নিজের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ দিন ধরে পরিচালিত হওয়া স্কুলটি চাইলেই নিজের কারো নামে স্মৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। অথচ গ্রামের শিক্ষা, সভ‍্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ‍্যের কথা মাথায় রেখেই "পশ্চিম সৈয়দ পুর প্রাইমারি স্কুল" নাম দিয়েই গণশিক্ষা বিভাগে নিবন্ধন করে বাড়ির বাংলা ঘরেই স্কুলটি যথারীতি পরিচালনা করতে থাকেন।


ষাটের দশকে সৈয়দপুরের কলেজ পড়ুয়া এক ঝাক তরুণ একটি ঐতিহাসিক উদে‍্যগ গ্রহন করেন। দীর্ঘ দিনের প্রতীক্ষিত ও প্রত‍্যাশিত একটি হাই স্কুল গ্রামের মাটিতে তাদের নেতৃত্বেই এর গোড়া পত্তন হয়। প্রথম দিকে জুনিয়র স্কুল হিসেবে চৌধুরী বাড়ির বাংলায় চালু হলেও স্কুলটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি অনুমতি ও স্বীকৃতির প্রথম শর্ত হিসেবে নিজস্ব জায়গায় স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিলে মোটামুটিভাবে তেমন কোন জুড়ালো আপত্তি ছাড়াই প্রাথমিক পছন্দ হিসেবে বড় গোলের পশ্চিম প্রান্তে বর্তমান প্রাইমারি স্কুলের জায়গায় সহানাম্ভের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সে মোতাবেক সুনামগঞ্জের তৎকালীন এস,ডি,ও একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ‍্যমে উক্ত জায়গায় এক কোদাল মাটি কেটে সৈয়দ পুর হাই স্কুলের স্থান নির্ধারণ করেন। যদিও সে উদে‍্যগটি গ্রামীন কোন এক অপ্রত‍্যাশিত ইসু‍্যতে পূর্ণতা পায়নি এবং বেশ কিছুদিন পরে বর্তমান জায়গায় সৈয়দপুর জুনিয়র হাই স্কুল হিসেবে স্থানান্তরিত হয়।এতে হাড়িকোনা ও পশ্চিম পাড়ার অনেকেই মনঃক্ষুন্ন ও হতাশ হন। এই সুযোগে জনাব ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী হাড়িকোনা ও পশ্চিম পাড়ার মানুষের অনুভূতির কথা মাথায় নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠিত প্রাইমারি স্কুলটি আমাদের বাড়ি থেকে উভয় পাড়ার ঠিক মধ‍্যবর্তি স্থানে স্থানান্তরের উদে‍্যগ গ্রহন করেন। এলাকার মানুষের স্বতঃপূর্ত অংশগ্রহন ও সহযোগিতায় অল্প সময়ের মধে‍্যই স্কুলটি বর্তমান জায়গায় বাঁশপালার ঘর তৈরী করে স্থানান্তরিত হয় এবং একই বছর জেলা প্রাইমারি শিক্ষা অফিস ইলিয়াছ হোসেন কোরেশীর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তার মেয়ে মোছাঃ রাহেনা কোরেশীকে রানিং শিক্ষক দেখিয়ে সরকারের গণশিক্ষা বিভাগে সরকারিকরণের জন‍্য প্রেরণ করে। অবশ‍্য স্কুলটি আমাদের বাড়িতে থাকাকালিন সময়েই লোকমুখে রাহেনার স্কুল হিসেবে পরিচিত ছিল। অবশেষে তৎকালীন সরকার ১৯৬৯ সালে দেশের বেশ সংখ‍্যক স্কুলের সাথে একযোগে পশ্চিম সৈয়দপুর প্রাইমারি স্কুলকেও সরকারি প্রাইমারি স্কুল হিসেবে ঘোষনা করে গেজেট প্রকাশ করে।


জানুয়ারী ১৯৭০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি প্রাইমারি স্কুল হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলে দেশে বিদেশে অবস্থানরত এলাকার মানুষ আনন্দচিত্তে এটিকে গ্রহন করে। সরকারি চাকুরির নীতিমালার পরিপন্থী হওয়ায় সরকারি চাকুরিতে থাকাকালীন নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের ম‍্যানেজম‍েন্ট কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিজে না নিয়ে এক সময়ের খ‍্যাতিমান ক্রিয়া সংগঠক, শিক্ষানরাগী সমাজসেবী সমবয়সি সম্পর্কিয় চাচা জনাব আবুল বশর কোরেশীকে স্কুল ব‍্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি করে নিজে অন‍্য স্কুল থেকে বদলি হয়ে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহন করেন। অত‍্যন্ত কর্মঠ, উদ‍্যমী ও তরুন শিক্ষকবৃন্দ সর্ব জনাব সৈয়দ ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আবুল ফজল টুনু, সৈয়দ নুনু মাস্টার, মোছাঃ রাহেনা বেগমকে নিয়ে অতি অল্প সময়ের মধে‍্য স্কুলটিকে সর্বমহলের কাছে এলাকার একটি স্বনামধন‍্য সরকারি প্রাইমারি স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই স্কুলটিকে ঘিরে তখনকার যুক্তরাজ‍্য প্রবাসি পশ্চিম সৈয়দপুর বাসীদের বাধভাঙ্গা আনন্দ উদ্দীপনায় এলাকায় ছাত্র ছাত্রী, অভিভাবকরা মানসম্মত লেখাপড়ার প্রতি অতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। যুক্তরাজ্য থেকে এলাকার প্রায় সকল প্রবাসীরা চাদা তুলে তখনকার সময়ের জন‍্য একটি আধুনিক বিল্ডিং তৈরি করে গ্রামের শিক্ষার উন্নয়নে অবদান রাখতে উদে‍্যাগী হন। লন্ডন প্রবাসী কর্তৃক মনোনীত কোষাধ‍্যক্ষ শিক্ষানুরাগী মুরব্বি জনাব মরহুম সৈয়দ মর্তুজা আলি সাহেবের তত্বাবধানে অতি অল্প সময়েই দৃষ্টিনন্দন একটি স্কুলভবন নির্মিত হয়।এলাকাবাসী প্রবাসীদের এ অনবদ‍্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাজ‍্য প্রবাসী জনাব মর্তুজা আলী সাহেবকে স্কুল ব‍্যবস্থাপনা কমিটির দ্বিতীয় কমিটিতে সভাপতি মনোনীত করেন।


দীর্ঘ চাকুরীজীবন শেষে জনাব ইলিয়াছ হোসেন কোরেশী নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল থেকেই ১৯৮৪ সালে অবসরগ্রহন করে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্কুল ম‍্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একমাত্র মেয়ে মোছাঃ রাহেনা বেগম একই স্কুল থেকে সহকারি শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহন করে বর্তমানে নিউইয়র্কে সন্তানদের সাথে বসবাস করছেন। এবং ছেলে শামীম কোরেশী সরকারি জনতা ব‍্যাংকের হেড অফিসে ডিজিএম হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।


অত‍্যন্ত মেধাবী আমাদের প্রিয় এই বড় চাচা ১৯৯৩ সালের ১৮-ই জুন শেষ নিঃশ্বাস ত‍্যাগ করে জান্নাতবাসী হন। বিধাতার কাছে আমাদের সবার প্রত্যাশা আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের উচুঁ মোকাম দান করেন। আমীন
লেখক: কলামিস্ট ও সম্পাদক, ব্রেকিংস২৪