একই সঙ্গে কোভিড ও ডেঙ্গু

একই সঙ্গে কোভিড ও ডেঙ্গু

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ


সাম্প্রতিক সময়ে একই সঙ্গে করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসী নাকাল। কোভিড–১৯ ও ডেঙ্গু জ্বর—দুটোই ভাইরাসজনিত রোগ, এদের মধ্যে উপসর্গজনিত মিল-অমিল আছে। আবার দুটিই জটিল হয়ে পড়তে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

দুই রোগের সংক্রমণের হার বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা, সুযোগ-সুবিধা আর চিকিৎসাসেবার ওপরও পড়েছে চাপ। আবার দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো রোগীর ডেঙ্গু আর কোভিড একসঙ্গেই হয়েছে। তখন চিকিৎসাব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। কেউ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সেখানে গিয়ে কোভিড–১৯ রোগীর সংস্পর্শে এসে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

উপসর্গের মিল-অমিল
ডেঙ্গু ও কোভিড দুটোই ভাইরাসজনিত রোগ। তাই দুটোতেই জ্বর হলো প্রথম ও প্রধান উপসর্গ। মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদও থাকতে পারে। তবে ডেঙ্গুতে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, গায়ে ব্যথা তীব্র হয়। এ জন্য একে আগে ব্রেক বোন ফিভার বলা হতো। মানে যে জ্বরে শরীরে হাড় ভেঙে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। ডেঙ্গু হলে জ্বরও তীব্র মাত্রার হয়, ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠে যেতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের দু–তিন দিনের মাথায় শরীরের ত্বকে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি হতে দেখা যায়, যা সাধারণত কোভিডে আক্রান্ত হলে হয় না।

উল্টো দিকে কোভিড বারবার তার চরিত্র বদলাচ্ছে। বর্তমানে যে ধরনটি ছড়িয়ে পড়ছে তাতে জ্বর তীব্র মাত্রার নয়, আবার দীর্ঘস্থায়ীও নয়। দু–তিন দিনের মাথায় জ্বর সেরে যায়। আবার কোনো জ্বর বা উপসর্গ ছাড়াও আছেন বিপুলসংখ্যক আক্রান্ত মানুষ। জিবের স্বাদ চলে যাওয়া, নাকে গন্ধ না পাওয়া কোভিডের একটি বড় লক্ষণ, তবে সবার না–ও হতে পারে। কারও কারও পেটে ব্যথা, ডায়রিয়াও হচ্ছে।

ডেঙ্গুর জটিলতা লক্ষণীয় হয় পাঁচ দিনের মাথায়। তখন নাক, দাঁত বা অন্য কোথাও থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। রক্তনালির ভেতর থেকে রক্তরস বেরিয়ে এসে (প্লাজমা লিকেজ) পেটে, বুকে পানি জমতে পারে। জটিলতা বেশি হলে রোগী শকে চলে যেতে পারে, অর্থাৎ হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

কোভিডেরও জটিলতা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর, কারও পাঁচ কি ছয় দিনের মাথায়, কারও বেলায় সাত দিন পর। শ্বাসকষ্ট হতে পারে, রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

জ্বর হলে কী করবেন
যেহেতু এখন দু–দুটো রোগের ব্যাপক সংক্রমণজনিত ক্রান্তিকাল চলছে, তাই জ্বর হলে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। পরিবারে ছোট–বড় যে কারও জ্বর হলে সতর্ক হতে হবে। মনে রাখবেন ডেঙ্গু জ্বরের জটিলতা শিশুদের বেশি হয়, এমনকি মৃত্যুহারও শিশুদের বেশি। আবার কোভিডে বয়স্ক, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ ইত্যাদি আছে তারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য দুটি রোগই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিবারে কেউই ঝুঁকিমুক্ত নয়।

তাই জ্বর হলে নিজেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা করে নেবেন। দুটি সংক্রমণই আপনার কাছ থেকে অন্যদের কাছে যেতে পারে, একটা মশার কামড়ের মাধ্যমে, অন্যটা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে। তাই আলো-বাতাসপূর্ণ একটি আলাদা কক্ষে বিশ্রাম নিন। প্রচুর পানি, তরল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন। তারপর যত দ্রুত সম্ভব টেলিফোনে, অনলাইনে বা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু নির্ণয়ের জন্য এনএসওয়ান অ্যান্টিজেন (দেরি হলে অ্যান্টিবডি) আর কোভিড নির্ণয়ের জন্য আরটি–পিসিআর পরীক্ষা করে ফেলুন। এর বাইরে রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) দুই ক্ষেত্রেই দরকার হবে। পরবর্তী সময়ে দুটি আলাদা রোগের জন্য আলাদা কিছু পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।

নিজে নিজে এর-ওর কথায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে ওষুধ শুরু করে দেবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, রোগ শনাক্ত না করে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডেঙ্গু হলে সাধারণত জ্বর কমাতে কেবল প্যারাসিটামল দেওয়া হয়, আর কিছু নয়। মৃদু কোভিডের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো ওষুধ লাগে না।

ডেঙ্গু ও কোভিড একসঙ্গেও হচ্ছে অনেক জায়গায়। দুটি রোগের চিকিৎসা একসঙ্গেই চলতে পারে। এতে বেশি সতর্কতা দরকার হয়। কারণ, কোভিডে রক্ত জমাট না বাঁধার জন্য রক্ত তরলীকরণের ওষুধ দেওয়া হয়, ওদিকে ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ একটি বড় সমস্যা। তবে গবেষণা বলছে, সঙ্গে ডেঙ্গু থাকলেও সতর্কতার সঙ্গে রক্ত তরলীকরণ হেপারিনজাতীয় ওষুধ দিতে বাধা নেই। তবে এসব চিকিৎসা অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নিতে হবে।

মূল কথা প্রতিরোধ
ডেঙ্গু ও কোভিড দুটোই প্রতিরোধযোগ্য রোগ। এই সময় যখন চারদিকে এ ধরনের রোগীর আক্রান্ত হওয়ার হার ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, হাসপাতালগুলো পরিপূর্ণ, তখন নিজের পরিবারের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায় এডিস মশা নির্মূলের মাধ্যমে। নিজের বাসা–বাড়ি, আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। টবের নিচে, বারান্দায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের নিচে, পরিত্যক্ত টায়ারে বা গ্যারেজে যেন পানি না জমে থাকে। নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটান এসব জায়গায়। এডিস মশার ডিম এক বছর পর্যন্ত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, তারপর বৃষ্টি এলে লার্ভা তৈরি করে। তাই পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধন অভিযান কেবল বর্ষায় নয়, সারা বছর ধরে চালাতে হবে। দিনের বেলা শিশুদের মশারি টানিয়ে ঘুম পাড়াবেন। ফুলহাতা জামাকাপড় পরাবেন। রিপেলেন্ট ক্রিম লাগাতে পারেন। পাড়া–মহল্লার সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করুন, তবে মশামুক্ত হতে পারবেন।

কোভিড প্রতিরোধ ডেঙ্গুর চেয়েও সহজ আর সস্তা। একটি মাস্ক আর একটি যেকোনো মূল্যের সাবানই আপনাকে সুরক্ষা দিতে পারে। কঠোর লকডাউন উঠে গেছে, তার মানে এই নয় যে অকারণে বাইরে ঘুরে বেড়াবেন, হইচই করবেন, পার্টি করবেন। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে এক মুহূর্তও নয়, আর সর্বদা বাইরে মাস্ক পরে থাকবেন। বারবার হাত পরিষ্কার করবেন। অন্যের সঙ্গে ন্যূনতম ৩ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবেন। সরকার টিকা গ্রহণের বয়সসীমা শিথিল করেছে, তাই প্রথম সুযোগেই টিকা গ্রহণ করে ফেলুন।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও কোভিড–১৯ বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা

সূত্র: প্রথম আলো